ফ্রি- ফায়ার পাবজি লাইকি বন্ধের নির্দেশ হাইকোর্টের? ফ্রি- ফায়ার, পাবজি নাকি বন্ধ করে দিবে হাইকোট?

২০২১ সালের ২৪শে জুন দেশীয় সব অনলাইন প্ল্যাটফর্মে টিকটক, বিগোলাইভ, লাইকি, পাবজি এবং ফ্রি ফায়ারের মতো গেমসগুলো বন্ধের নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট আবেদন করা হয়। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হুমায়ুন কবির পল্লব এবং মোহাম্মদ কাউছার এই রিট আবেদনটি করেন। ওই রিট আবেদনের শুনানিতেই সোমবার এই নির্দেশ দেয়া হল

করোনা কালে মোবাইল গেমসের জনপ্রিয়তা বেড়েছে। পাবজি-ফ্রি ফায়ার গেমসহ লাইকি, বিগোর মতো ভিডিও স্ট্রিমিং অ্যাপ বন্ধের দাবি উঠছে অনেক দিন ধরেই। এ নিয়ে আদালতে রিটও হয়। অবশেষে উচ্চ আদালত ‘ক্ষতিকারক’ অনলাইন গেমের সব ধরনের লিংক বা ইন্টারনেট গেটওয়ে তিন মাসের জন্য বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন।

ভিডিও স্ট্রিমিং অ্যাপ বন্ধের বিষয়ে সুমন আহমেদ বলেন, ‘স্বাভাবিক ইন্টারনেটে এসব অ্যাপ চালানো বন্ধ করা যাবে। কেউ যদি ভিপিএন দিয়ে চালায়, তখন পুরোপুরি বন্ধ করা যায় না। তখন হয়তো ভিপিএন বন্ধের প্রসঙ্গ আসবে। এক ভিপিএন বন্ধ করলে অন্য ভিপিএন আসবে।’

বেসরকারি ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার সায়েন্স ও ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের এক গবেষণা বলছে, দেশে ২ কোটি ৬০ লাখ মানুষ বিভিন্ন ডিজিটাল গেম খেলে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে দিনে দু-তিন ঘণ্টা গেম খেলে কাটানোর প্রবণতা রয়েছে।

দেশে তরুণদের মধ্যে বেশি জনপ্রিয় ফ্রি ফায়ার, পাবজি, ক্লাস অব ক্ল্যানস, মাইন ক্র্যাফট, কাউন্টার স্ট্রাইক গ্লোবাল অফেন্স, কল অব ডিউটি ওয়ার জোনের মতো সহিংসতাপূর্ণ গেম। এসব গেমে অস্ত্রের ব্যবহার, মেরে ফেলা ও বোমাবাজি রয়েছে।
সহিংসতাপূর্ণ গেম মানুষের ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলে, তা নিয়ে আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের দুটি গবেষণায় দুই ধরনের ফলাফল দেখা যায়।

একটিতে দেখা যায়, যাদের মধ্যে সহিংসতাপূর্ণ মনোভাব থাকে, তারা এসব গেম খেলে সহিংস আচরণ করতে পারে। আরেকটি গবেষণায় বলা হয়, এ ধরনের ভিডিও গেম সাময়িক সময়ের জন্য হলেও সহিংস আচরণ উসকে দিতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও অনলাইন গেম আসক্তিকে মানসিক সমস্যা হিসেবে গ্রহণ করেছে।

করোনাকালে শিশু-কিশোর ও তরুণ-তরুণীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অনলাইন গেম খেলে কাটানোর বিষয়টি নিয়ে অনেক অভিভাবক উদ্বিগ্ন। দীর্ঘক্ষণ ডিজিটাল ডিভাইসের পর্দার সামনে থাকলে শিশু-কিশোরদের চোখের নানা সমস্যা হতে পারে বলেও জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা। তবে অনেকে গেম খেলে ও অনলাইনে স্ট্রিমিং করে আয়ও করেন।

উদ্বিগ্ন অভিভাবকেরা সব গেম নয়, ক্ষতিকর গেম ও অ্যাপ বন্ধের পক্ষে। তাঁরা হাইকোর্টের নির্দেশের পর স্বস্তির কথা জানিয়েছেন। শুধু মাত্র তিন মাস নয় আদালত যেন পরবর্তী সময়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়ে এসব ক্ষতিকর গেম স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেন।’
আজ সোমবার (১৬ আগস্ট ) হাইকোর্টের বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি মো. কামরুল হোসেন মোল্লার সমন্বয়ে গঠিত ভার্চুয়াল বেঞ্চ এ বিষয়ে আদেশ দেন।

রিটকারী আইনজীবী ব্যারিস্টার মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির পল্লব আদেশের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির পল্লব। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার নওরোজ মো. রাসেল চৌধুরী ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল গোলাম সরোয়ার পায়েল। আর বিটিআরসির পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী ব্যারিস্টার খন্দকার রেজা-ই-রাকিব।

মানবাধিকার সংগঠন ‘ল অ্যান্ড লাইফ’ ফাউন্ডেশনের পক্ষে সুপ্রিম কোর্টের দুই আইনজীবী ব্যারিস্টার মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির পল্লব ও ব্যারিস্টার মোহাম্মদ কাউছার গত ২৪ জুন হাইকোর্টে এ রিট আবেদন দাখিল করেন। এতে ডাক ও টেলিযোগাযোগ সচিব, শিক্ষাসচিব, স্বরাষ্ট্রসচিব, আইনসচিব, স্বাস্থ্যসচিব, বিটিআরসির চেয়ারম্যান, পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজি), বাংলাদেশ ব্যাংক, মোবাইল অপারেটর, বিকাশ ও নগদকে বিবাদী করা হয়। বিবাদীদের প্রতি আইনি নোটিশ দেওয়ার পরও কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় রিট আবেদন করা হয়।

রিট আবেদনে ওই সব অ্যাপস ও গেমের আড়ালে শত শত কোটি অর্থপাচার ও লেনদেনে জড়িতদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশনা চাওয়া হয়। পাশাপাশি ক্ষতিকর গেমস ও অ্যাপস বন্ধে বিআরটিসিকে নিয়মিত সুপারিশ করতে প্রযুক্তিবিদ, শিক্ষাবিদ ও আইনজীবী সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠনের নির্দেশনা চাওয়া হয়।

রিট আবেদনে বলা হয়, পাবজি ও ফ্রি ফায়ারের মতো গেমসে বাংলাদেশের যুবসমাজ এবং শিশু-কিশোররা ব্যাপকভাবে আসক্ত হয়ে পড়েছে। এসব গেমস যুবসমাজকে সহিংসতা প্রশিক্ষণের এক কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠছে। ফলে সামাজিক মূল্যবোধ, শিক্ষা, সংস্কৃতি বিনষ্ট হচ্ছে। এ ছাড়া টিকটক, লাইকি অ্যাপস ব্যবহার করে দেশের শিশু-কিশোর এবং যুবসমাজ বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হচ্ছে। সারা দেশে কিশোর গ্যাং কালচার তৈরি হচ্ছে। টিকটক অনুসারীরা বিভিন্ন গোপন জায়গায় পুল পার্টির নামে যৌন কার্যক্রমে লিপ্ত হচ্ছে। বাংলাদেশ থেকে দেশের বাইরে নারী ও অর্থপাচারের ঘটনায়ও টিকটক, লাইকি এবং বিগো লাইভ ব্যবহার চলছে। যা দেশের এবং জনস্বার্থের পরিপন্থী।

রিট আবেদনে আরো বলা হয়, বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং তাৎপর্যপূর্ণ বিধায় এ বিষয়টি কঠোরভাবে মনিটর করা প্রয়োজন। অনৈতিক এসব গেমস থেকে রক্ষা করতে শিশুদের জন্য উপযোগী ও যথাযথ অনলাইন গেমস তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি। ক্ষতিকর গেমস এবং অ্যাপস অনলাইন প্ল্যাটফর্ম থেকে সরিয়ে বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য একটি স্বাস্থ্যকর এবং উপযোগী সাইবার পদ্ধতি সুনিশ্চিত করতে সরকারের একটি কমিটি থাকা প্রয়োজন।

Leave a Reply

Your email address will not be published.